ইন্ডিয়া যাবার প্রথম অভিজ্ঞতা

২০১৫ সাল ছিল আমার ইন্ডিয়া যাবার প্রথম অভিজ্ঞতা। না কোন ভ্রমন উদ্দেশ্য নয়, ছিল চিকিৎসা করানোর উদ্দেশ্য। বাংলাদেশে ডাক্তার দেখানোর পর ভাল কোন ফলাফল পেয়েছিলাম না, যার কারণে ইন্ডিয়া গিয়েছিলাম। যদিও বাংলাদেশে একজন পরিচিত ডাক্তারের কাছে পরামর্শ নিয়েছিলাম যে, ইন্ডিয়া গিয়ে কোথায় দেখানো ভাল হবে। আমি নিজে থেকে ভ্যালর (সিএমসি) যাব ভেবেছিলাম, কিন্তু তিনি কলকাতায় দেখানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন।

আমি পরামর্শ অনুযায়ী যে মেডিকেলের কথা বলেছিলেন, সে মেডিকেলের বিভাগীয় প্রধানের সাথে বাংলাদেশ থেকেই যোগাযোগ করে নিয়েছিলাম ইন্টারনেটের মাধ্যমে। যদিও আমার জানা ছিলো না যে, উনিই সে মেডিকেলের প্রতিষ্ঠাতা। সেই যাই হোক, আমি যখন ইন্ডিয়া যেতে চাই ছিলাম তখন ইন্টারনেটে অ্যপয়েন্টমেন্ট ডেট নেওয়া লাগতো। তাই নিয়ম অনুযায়ী অ্যপয়েন্টমেন্ট ডেট নিয়ে কম-বেশি এক সপ্তাহের মধ্যে ভিসা পেয়েছিলাম। ভিসা পাওয়ার পর যাবার ডেট ঠিক করে ট্রেনের টিকিট কেটে ফেললাম।

রাজশাহী থেকে দর্শনা হল্ট হয়ে গেদে

আমরা (দুই জন ছিলাম) গেদে বর্ডার দিয়ে গিয়েছিলাম। তাই রওনা দেওয়ার তারিখ অনুযায়ী রাজশাহী থেকে ট্রেনে দর্শনা হল্ট রওনা দিলাম। গেদে দিয়ে ইন্ডিয়া যাবার জন্য রাজশাহী থেকে দর্শনা যাওয়ার জন্য সকলেই যাওয়া উত্তম; তাতে কষ্ট কম হবে। রাজশাহী থেকে সকাল ৬.৩০ মিনিটি সাগরদাড়ী নামে একটি ট্রেন খুলনার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় যা দর্শনা হল্ট হয়ে যায়। যাইহোক, আমারা যেইদিন ইন্ডিয়া যায় সেই দিন ছিলো জুম্মার দিন। দর্শনা পৌছাতে সকাল প্রায় ১০.৩০ বা ১১টা বেজে ছিলো। দর্শনা ষ্টেশনে পৌছার পর সেখান থেকে ভ্যানে করে বর্ডার পর্যন্ত পৌছালাম। বর্ডারে পৌছে কিছু কাজ থাকে যা করার জন্য নিজেকে কষ্ট করা লগে না। সেখানে সেই সব কাজ করে দেওয়ার জন্য অনেক লোক আছে, ১৫০/২০০ টাকার বিনিময়ে তারা আপনার কাজ করে দিবে। সকল কাজ সারার পর বর্ডার পার হওয়ার জন্য প্রস্তুত হলাম, কিন্তু খোজ নিয়ে জানলাম ঔপারে অর্থাৎ গেদে বর্ডারে কোন মসজিদ নাই, যেখানে জুম্মার নামাজ আদায় করতে পারবো। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম জুম্মার নামাজ পড়ার পর গেদে যাব।

গেদে থেকে শিয়ালদাহ্‌ (কলকাতা)

জুম্মার নামার শেষ করে বর্ডার পার হলাম। বর্ডার পার হয়ে গেদে বর্ডারে ব্যাগ চেকিং হয়। আমার কাছে ল্যাপটপ ছিলো। আমার জানা ছিলো না যে ল্যাপটপ থাকলে বাংলাদেশ বর্ডার থেকে তার একটা লিখিত থাকা লাগে। যা আমার ছিলো না। যার কারণে তারা আমাকে আবার বাংলাদেশ বর্ডারে ফেরত পাঠায় তা লিখে নিয়ে আসার জন্য। কি আর করা, আবার বাংলাদেশ বর্ডারে এসে ট্রাভেল ট্যাক্স পেপারের উল্টো পিঠে তা লিখে নিয়ে আবার গেলাম। যার কারণে গেদে থেকে ছেড়ে যাওয়া দুপুর ২টার ট্রেন মিস করেছিলাম।

যাইহোক, গেদে বর্ডারেও বাংলাদেশ বর্ডারের মতো কিছু কাজ থাকে, যাকে পদ্ধতির ভাষায় ইমিগ্রেশন নামে আমরা জানি। গেদে বর্ডারেও বাংলাদেশের মত অনেক লোক থাকে, এখানে আপনাকে ইমিগ্রেশনে সহজগীতা করার জন্য তারা ৫০ রুপি নিবে। তবে বাংলাদেশে যার মাধ্যমে আমরা ইমিগ্রেশন করেছিলাম সেই আমাদের বলে দিয়েছিলো গেদে এসে কার কাছে যেতে হবে। যথারীতি ইমিগ্রেশনের কাজ শেষ করে ট্রেনের টিকিট কাটলাম আর দুইটা সিম কিনে নিলাম কথা বলা ও ইন্টারনেট ব্যবহার করার জন্য। ঘনঘন ট্রেন চলাচল করাই বেশিক্ষন বসে থাকতে হয়নি। অল্প কিছু সময় পর ট্রেন এসে উপস্থিত হলো। ট্রেনগুলো খুব একটা বেশি সময় অপক্ষা করে না তাই আমারাও দেরি না করে ট্রেনে উঠে পড়লাম, রওনা হলাম শিয়ালদাহ্‌ এর উদ্দেশ্যে।

যদিও আমরা যখন ট্রেনে উঠি তখন লোকজন খুবই অল্প ছিলো ট্রেন যত ষ্টেশন পার হয় ততোই লোকজন বাড়তে থাকে। আপনারা হয়তো জেনে থাকবেন ইন্ডিয়াতে ট্রেন গুলো বিদ্যুৎ এর মাধ্যমে চলে। যার কারণে খুব দ্রুত গতীতে ট্রেন যাচ্ছিলো। মোটামুটি আমারা সন্ধারপর শিয়ালদাহ্‌ ষ্টেশনে পৌছালাম। সেই সময় রমজান মাস ছিলো আর মাগরিবের সময় ট্রেনে থাকাবস্থায় হয়ে গিয়েছিলো, তাই ট্রেনের ভিতরেই অল্পকিছু খাবার খেয়ে ইফতারি করে নিয়েছিলাম।

থাকার জন্য হোটেলের সন্ধান

শিয়ালদাহ্‌ ষ্টেশনে পৌছার পর কোথায় যাব তা জানা ছিলো না। তবে আশে পাশে আবাসিক হোটেল থাকবে এতটুকু নিশ্চিত ছিলাম। তাই খুব একটা দুশচিন্তা না করে মাগরিবের নামাজ পড়ার জন্য মসজিদ খুজতে লাগলাম। মসজিদে নামাজ পড়ে বের হয়ে লোকজনকে জিজ্ঞাসা করলাম আসে পাশে থাকার মতো কোন আবাসিক হোটেল পাওয়া যাবে কিনা। তখন এক বাংলাদেশি লোকের সাথে পরিচয় হলো সেই আমাদের একটি মানসম্মত আবাসিক হোটেল নিয়ে গেল। ষ্টেশন থেকে খুব একটা বেশি দুর ছিলো না। যাইহোক, হোটেলে উঠে ফ্রেস হয়ে ডাক্তারকে ফোন করলাম। কথা অনুযায়ী পরের দিন আমাদের ডাকলেন।

কিছু জায়গায় ঘোরাঘুরি

যেহেতু সেই মেডিকেলের প্রধানের সাথে যোগাযোগ করে চিকিৎসা নিতে গিয়েছিলাম তাই ডাক্তার এর সিরিয়াল ও অন্যান্য কাজে মোটেও কোন বেগ পেতে হয়নি। আর সেই সুবাদে বাকি সময়গুলো একটু এদিক সেদিক ঘুরাফেরাই কাটিয়ে ছিলাম। কলকাতায় দেখার মতো খুব একটা বেশি কিছু নাই। চিড়িয়াখানা, কয়েকটা পার্ক আর যাদুঘর। তবে যাদুঘরে একটু মাজা হয়েছিলো।

যাদুঘর দেখার জন্য যখন গেলাম দেখলাম যাদুঘরের টিকিট কাউন্টারের উপর লিখা আছে যে, টিকিট প্রতি ২০ অথবা ৩০ রুপি (অনেক দিন হওয়ায় ঠিক মনে পড়েছে না) ইন্ডিয়ার নাগরিকের জন্য আর বাইরের দেশের লোক জনদের জন্য ২০০ কি ৩০০ রুপি। সাইবোর্ডটা দেখে মেজাজটা একটু খারাপ হয়ে গেল। কিন্তু সাথে সাথে এটাও মাথাইে এলো যে, বাংলাদেশি আর ইন্ডিয়ার লোকজনের চেহারাই কোন পার্থক্য করা যায় না। তাই কাউন্টারে গিয়ে বাংলাই না কথা বলে একটু হিন্দি ভাষায় বল্লাম “দো টিকিট দে জিয়্যে” দুইটা টিকিট দেন। ব্যস ২০ রুপি করে দুইটা টিকিট নিয়ে ঢুকে পড়লাম। এইভাবে কম খরচেই জাদুঘর দেখা শেষ করলাম

Inside of Quest Mall

বাটপারের ক্ষপ্পরে

ঘোরাঘুরি করার জন্য একদিন কলকাতা নিউমার্কেট গেলাম। আমি যে মোবাইলটা তখন ব্যবহার করতাম তার ডিসপ্লের কিছু অংশ ভেঙ্গে গিয়েছিলো, তাই ভাবলাম সেখানে ঠিক করে নিলে মন্দ হয় না। নিউমার্কেটের আশে পাশে চাঁদনি চক নামে একটি জায়গা আছে সেখানে আমার মোবাইলাটা ঠিক করতে দিলাম। তারা বল্লো সন্ধার পরে আসতে। তাই আমারা পাশের আরেকটি মোবাইল মার্কেটে গেলাম একটা নতুন মোবাইল কেনার জন্য। সেখানে মোবইল কিনতে দেরি হওয়ায় সেদিন আমার মোবাইলটা নিতে পারলাম না। তাই সেদিন মোবাইলটা না নিয়েয় আমারা হোটেলে ফিরলাম।

পরের দিন আবার মেডিকেল গেলাম, সেই দিন ডাক্তার আমাদের চিকিৎসা সম্পূর্ণ করে বল্লো আমারা এখন দেশে ফিরে যেতে পারি। এইদিকে আমাদের আর কোন কাজ না থাকাই সিদ্ধান্ত নিলাম সেইদিনই চলে আসবো। তাই মোবাইল নেওয়ার জন্য আবার চাদনি চক গেলাম। যেখানে মোবাইলের ডিসপ্লে পরিবর্তন করতে দিয়েছিলাম তার পাশেই দেখলাম বিভিন্ন রকম 16gb, 32gb, 64gb, 128gb পেনড্রাইভ বিক্রি করেছে খুবই অল্প দামে। তাই কিছু পেনড্রাইভ নেওয়ার কথা ভাবলাম এর জন্য যে দোকানে মোবাইল ঠিক করতে দিয়েছিলাম তাকে বল্লাম এই পেনড্রাইভ গুলো কেমন হবে। সে ন্যাগেটিভ ভাবেই বল্লো দেখেন এর মধ্যে থেকে যদি কিছু ভাল পান! তাই মনে করলাম চেক করে নেই, ঠিক আছে কিনা। আমার কাছে তখন ল্যাপটপ ছিলো, কিন্তু যে ভাই আমার সাথে ছিলো সে বল্লো, দরকার নেই এখানে ল্যাপটপ বের করে চেক করার। তাই আর চেক করা হলো না। এইদিকে আমার মোবাইল পেলাম কিন্তু ডিসপ্লে ঠিক করতে গিয়ে আমার মোবাইলটাই ডেড করে দিয়েছিলো।

যাইহোক দুঃখের কথা, এই সেই করতে করতে দেরি হয়ে গিয়েছিলো, তাই আমাদের বাড়ি ফিরার জন্য শিয়ালদাহ্‌ থেকে বিকালের ট্রেন ধরতে হয়েছিলো গেদে আসার জন্য। কিন্তু গেদে যেতে অনেক রাত হয়ে যাবে। তাই যেই ভাইটা গেদেতে আমাদের ইমিগ্রেশনের করে দিয়েছিলো সে বল্লো রাত্রে গেদে আসার দারকার নেই। আমরা যেন রানার ঘাট নামে ষ্টেশনে নেমে কোন একটি হোটেলে উঠি। কারন গেদেতে কোন হোটেল নেই। তাই তার কথা অনুযায়ী রানার ঘাট ষ্টেশনে নেমে ষ্টেশনের পাশেই একটি হোটেলে উঠলাম। সেখানে উঠে প্রথমে পেনড্রাইভ গুলো চেক করতে লাগলাম। কিন্তু একটা পেনড্রাইভও ভালো না, সব ভুয়া। সব গুলো শুধু ফাকা প্লাসটিকের মাথাই ইউএসবির মাথাটা লাগোনো আছে। পুরো টাকাটাই নষ্ট। একেতো আমার ভাল মোবাইল ডেড হলে অপরদিকে যতগুলো পেনড্রাইভ কিনেছিলাম তার সবই ভুয়া। কি আর করার, পরের দিন সকালে গেদে হয়ে আবার দর্শনা পৌছে রাজশাহীর ট্রেন ধরলাম। শেষ হলো ইন্ডিয়া সফর।

1 Comment

Add a Comment
  1. Valo laglo pore….

মন্তব্য